চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনভূমি দখলের হিড়িক: উচ্ছেদের পরও ফের দখল, অসহায় বনবিভাগ
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের সংরক্ষিত বনভূমি যেন দখলদারদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, ফুলছড়ি রেঞ্জের আওতাধীন ডুলাহাজারা,খুটাখালী, মেধাকচ্ছপিয়া, বনবিটে সরকারি বনভূমি দখল করে একের পর এক গড়ে উঠছে বসতঘর, দোকানপাট,পাহাড় কাটা, বালিউত্তোলন শিক্ষাপ্রতিষ্টান, মসজিদ মুরগির খামারসহ নানা ধরনের অবৈধ স্থাপনা।এসব বনবিট কার্যালয়ের অদূরেই প্রকাশ্যে বনভূমি দখলের এমন কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর প্রতিরোধ না থাকায় স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। খোদ, রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তারা মাসোহারা নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী,ফুলছড়ি রেঞ্জ কার্যালয়ের প্বার্শবর্তী মেধা কচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, মালুমঘাট খ্রীস্ট্রান মেমোরিয়াল হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা এখন ব্যাপক লুটতরাজ চলছে। পাশে ডুলাহাজারা রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন মাদারট্রি গর্জন বাগান ও সামাজিক বনায়ন এলাকার বনভূমিতে বেশ কিছুদিন ধরে দখলদারিত্ব চলছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে বনভূমির বিভিন্ন অংশ দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন বসতি, মুরগির খামার ও ব্যবসায়িক স্থাপনা। ফলে ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে সংরক্ষিত বনভূমি।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি শক্তিশালী দখলদার সিন্ডিকেট বন বিভাগের জমি দখলে সক্রিয় রয়েছে। বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নীরবতার সুযোগে তারা দিনের পর দিন নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণ করছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরও একই স্থানে পুনরায় স্থাপনা নির্মাণের ঘটনায় বনভূমি রক্ষায় বন বিভাগের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডুলাহাজারা বনবিট কর্মকর্তা শাহরিয়ার আমিন বনভূমি জবরদখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা জবরদখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি। কিন্তু দখলবাজ চক্রের পক্ষ থেকে প্রাণনাশের হুমকির আশঙ্কা থাকায় সেখানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে সাহস পাচ্ছি না।
এ বিষয়ে চকরিয়া পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)'র সভাপতি একেএম বেলাল উদ্দিন বলেন, সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা না হলে ধীরে ধীরে সরকারি বনভূমি সংকুচিত হবে। এর ফলে বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জানতে চাইলে ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) কামরুল হাসান বলেন, ডুলাহাজারা বনবিটের ওই এলাকায় ইতোমধ্যে কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে অবৈধ স্থাপনা ও মুরগির খামার উচ্ছেদ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছে। রেঞ্জের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা খসরুল আমিন বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের পরও জড়িত দখলদাররা সেখানে পুনরায় মুরগির খামারসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছে। এ অবস্থায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে সেখানে কঠোর অভিযান পরিচালনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সোয়াজাইননা নতুন পাহাড় এলাকায় পাহাড় কেটে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে সৌদি প্রবাসী মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে। তিনি মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে। সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণেরও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের নতুন মসজিদ, রিংভং ও ছগিরশাহকাটা এলাকায় মৃত আস্কর আলীর ছেলে আমির হামজার বিরুদ্ধেও বাড়িঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহল বলছে, সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষায় শুধু অভিযান পরিচালনা করে স্থাপনা উচ্ছেদ করলেই হবে না; উচ্ছেদের পর যাতে পুনরায় দখল না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বনভূমি দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও নেপথ্যের প্রভাবশালী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের আশঙ্কা, এখনই বনভূমি দখল বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে ডুলাহাজারার সংরক্ষিত বনাঞ্চল আরও সংকুচিত হবে। এতে বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিতর্কিত ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসর রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে বনভূমি বিক্রি করে কোটি টাকার বানিজ্যের অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে একাধিক অভিযোগে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকাসহ বিভিন্ন গনমাধ্যমে নানা অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হলে ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তার আস্থাভাজন হওয়ায় গত এক বছরের বেশী সময় ধরে তিনি এখনো স্বপদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি প্রতিমাসে বালিখেকো বনভূমি দখলদার ও দেশের একমাত্র সর্ববৃহৎ মাদার ট্রি গর্জন গাছ ও ভূমি বিক্রি করে অন্তত ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তিনি আখের গুছিয়ে এখন বদলীর তকবির করে দ্রুত সরে ছিটকে পড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এমন কি এক মহিলার কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে ৪০ শতক বনভূমিতে বসতবাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন এই এই রেঞ্জ কর্মকর্তা। তাও আবার মেধা কচ্ছপিয়ার জাতীয় উদ্যানের মাদার ট্রি গর্জন বাগানের ভেতরে।এই গর্জন বাগানের ভিতরে রীতিমতো বাজার বসিয়ে দিয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুস। তার এসব অপকর্ম নিয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মারুফ হোসেনের কাছে স্থানীয় লোকজন, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা অসংখ্যবার লিখিত এবং মৌখিক অভিযোগ দিলে ও অদৃশ্য কারণে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মারুফ হোসেন বলেন, যে সব বিষয়ে অভিযোগ আসে সেসব বিষয়ে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিচ্ছি।কোন ভূমি দূস্য, বনদূস্য বালুখেকো বনভূমি জবরদখলকারীর সাথে বন বিভাগের কারো সাথে কোন প্রকার আতাঁত কিংবা অবৈধ লেনদেন প্রমান পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। দৃশ্যমান অনিয়ম দূর্নীতি ও বনভূমি দখলে বনবিভাগের পরোক্ষ সহযোগিতা কি বিভাগীয় বনকর্মকর্তা দেখেন না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার নজরে আসলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।সবশেষে তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বন বিভাগের অসহায়ত্বের বিষয়টি অপকটে স্বীকার করেন।
Editor: Abdullah Al-Mamun, Office Address: Suit No. 501, 5th Floor, Motaleb Mansion, 2 RK Mission Road, Dhaka-1203, Bangladesh, Email: news.bbcnewsbd@gmail.com, Phone: 01796-777753