মনের গভীর গহ্বরে জমে থাকা অজস্র অশ্রুবিন্দু আর অব্যক্ত অনুভূতিরা যখন কলমের ডগায় এসে শব্দ হয়ে ঝরে পড়ে, তখন তা আর কেবল লেখা থাকে না—তা হয়ে ওঠে প্রেমের এক নিরব অভিসার। আমি লিখি, কারণ বললে বোঝে না কেউ, আমি জানি, প্রেমপত্র নয়—তবু প্রেমেরই এক রূপ আমার এই মনের কথা। যার হৃদয়ে কথারা শুধু হাওয়ার মতো উড়ে বেড়ায়, যার চোখে ধরা পড়ে না, তবু মনের আকাশে সে রঙ ছড়িয়ে দেয়—সে আমার ভালোবাসার একমাত্র পাঠক, আমার বৌ। আমার ভাষাহীন ভালোবাসার ভাষা একমাত্র তিনিই বোঝেন। এই লেখা সেই রোমান্সের উৎসার, যেখানে প্রেম নেই, তবু প্রেম জড়িয়ে থাকে প্রতিটি কথায়।
আমার মনের কথা মনে জমিয়ে থাকে বলতে পারি না কারো কাছে, কিন্তু মনের কথা লিখতে পারি তবে “প্রেম পত্র নয়!” মনের কথা, মনে জমে থাকাতে জীবনে কত মনের মানুষকে কাছ থেকে হারিয়েছি। আমাকে অনেক মানুষ মনহীন মানুষ বলেন। এর মধ্যে একটি গান মনে পড়ছে- ভাবী যেন লাজুক লতা হলা গলা কিছু বুঝে না। মনের কথা মনে রাখে মুখে আনে না। তবে যে মানুষটি আমার মনের কথা বুঝতে পেরেছে এবং এখনও বুঝে এবং বুঝার চেষ্টা করে সেই মানুষটি হচ্ছে আমার বৌ! আমার বৌ ব্যচারীর মনের কথা আমি বুঝতে পারলেও কিন্তু আমলে নিই নাই কখনও। তার জন্য মনের কথা বুঝার মানুষ হিসেবে আমার বউয়ের কাছে আমি অপরাধী। কিছুদিন যাবত আমি অনেক কথা লিখে আসছি বাঁকা কথা, টক্টক্ কথা, নারী কথা, সমকথা, কথার কথা, সারকথা, জীবন কথা, তাহাদের কথা, গোপন কথা, আপন কথা, আমার মিথ্যা কথা এবং কথার বাইরের কথা। আমি পাগল হতে চাই। মনের সবকথা একেবারে লিখে দিতে ইচ্ছে হয় তবে যে পরিমাণ মনের কথা মনে জমে আছে সবকথা একসাথে লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। সইলো সই দুটো মনের কথা কই। ও পাগল মনরে, মন কেন এত কথা বলে। মন তুমি কৃষি কাজ জানো না শুধু কৃষি কাজই নয় মন অনেক কিছু জানো না, আবার এমন অনেক কিছু জানো না যা ভাবা যায় না। মন তুমি প্রেম দিতেও জানো না নিতেই জানো না। তাই তার এত ব্যাকুলতা এত অস্থিরতা তাই সে মেঘের সঙ্গী হতে চায়। তাই তার কোথাও হারিয়ে যাওয়ার মানা নেই। সে জন্যই সইলো সই দু’টা মনের কথা কই, দু’টা মনের কথা শোনার জন্যে মন নিজেই মনের মানুষ খোঁজে।
কিন্তু মনের মন্তরতম, গোপনতম কথা বলার লোক মেলা কঠিন। সবকথা কাকেই বলা যায়। তবু মন হু হু করে ওঠে সব কথা বলার জন্য। স্ত্রী নয় মা-বাপ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নয়। এমন কাউকে সব কথা বলা যিনি নির্বিকার ভাবে এসব কথা শুনে যাবেন। যার কাছে মনের ভাব উজার করা যাবে। এই মনের ভাব উজার করার জন্যে সাহেবদের দেশ মনস্তত্ত্ববিদেরা রয়েছেন। আমাদের দেশে মনের চিকিৎসার এখনও তেমন প্রচলন ঘটেনি। দেখনুতো আমার মত আরো যারা মন পাগল আছে তাদের মনের ভাব কেমন।
মানুষ মনে মনে নিজেকে কত কী ভাবে, নিজেকে কেউ ভাবে রাজা- উজিড়। কেউ ভাবে উত্তম কুমার কিন্তু সবাই যে ভালো দিকে ভাবেন তা নয়, এক সাহেব নিজেকে কুকুর ভাবতেন! এক মনোবিজ্ঞানী বহুদিন ধরে তাঁকে দেখলেন। তাঁর চিকিৎসা করলেন। তাঁকে বুঝালেন যে তুমি কুকুর হতে যাবে কেন, তুমি আস্ত একটা মানুষ। ঐ কুকুর সাহেব ধীরে ধীরে চৈতন্যোদয় হল। তখন একদিন মনোবিজ্ঞানী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি যে কুকুর নন, সেটা এতদিনে বুঝতে পেরেছেন। সাহেব বললেন যে, হ্যাঁ স্যার এখন আমার আর ঐসব ধারণা নেই। মনোবিজ্ঞানী তখন বললেন তাহলে তো আপনি এখন বেশ ভালো আছেন, এই কথা শুনে সাহেব বললেন, নিশ্চয় স্যার। আপনি আমার এই নাকের নীচে হাত দিন, দেখুন কেমন সুন্দর ঠান্ডা। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়। কুকুরদের শরীর ভাল থাকলে নীচটা ঠান্ডা থাকে। সুতরাং এক্ষেত্রে সাহেবের কথা শুনে মনোবিজ্ঞানী নিশ্চয়ই খুবই হতাশ হয়েছিলেন, কারণ তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলেন সাহেবের কুকুরত্ব এখনও যায় নি।
সত্যিই এসব ব্যাপার সহজে যাওয়ার নয়। এক মেম সাহেবের ধারণা ছিল যে তিনি গরু। বহু চেষ্টা করেও মনো ডাক্তার যখন তাকে মনুষ্যত্বে ফেরাতে পারলেন না। তিনি জানতে চাইলেন, আচ্ছা মেম সাহেব আপনি কবে বুঝতে পারলেন যে আপনি গরু! মেম সাহেব নির্বিকার ভাবে জবাব দিলেন। সেই সবে বাছুর ছিলাম সেই তখন থেকে। এসব মনুষ্যত্ব ফিরে পেয়ে পুনমনুষ্য হয়ে সবাই যে খুশী হয় তা নয়। এক ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পরে আক্ষেপ করেছিলেন। গতকাল পর্যন্ত আমি একটা বিশাল গণ্ডার ছিলাম। আর আজ আমি সামান্য একটা মানুষ। প্রাত: স্মরণীয় শিবরাম চক্রবর্তী বলেছিলেন দুই যে শুধু চার হয় তা নয়। অনেক সময় দুই ও হয়। যাদের মানসিক সমস্যা আছে তাদের ব্যাপার আরও সুক্ষ্ম। তাদের কেউ কেউ ভাবেন দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ কিংবা তিন হয়। আবার কেউ কেউ ঠিকই জানেন দুইয়ে দুইয়ে চারই হবে কিন্তু তাদের চারটা পছন্দ নয়। তাদের বক্তব্য চার না হয়ে অন্য কিছু হলে ভালো হতো। এগুলি জটিল মনস্তত্ত্বের ব্যাপার। এবার সরল ব্যাপারে প্রঙ্গান্তরে যাওয়া যাক। এক মানসিক হাসপাতালের পাশাপাশি দুটি ঘর, নয় নম্বর ঘর এবং দশ নম্বর ঘর। নয় নম্বর ঘরে রয়েছেন ভুতনাথ এবং দশ নম্বর ঘরে দেবনাথ। দু’জনেরই মনোচিকিৎসা চলছে। দু’জনের ব্যাপারটা খুবই জটিল। যদিও বাইরে থেকে দেখে আপাত দৃষ্টিতে বিশেষ কিছুই বুঝা যায় না। তাদের মানসিক বৈকল্যের একমাত্র লক্ষণ যে তারা সর্বক্ষণ ‘জপমালা, জপমালা করছেন জপমালার মতো সারা দিন এই নাম জপছেন দু’জনে। একদিন পরিদর্শক এসেছেন হাসপাতালে। তিনি এই দুই ভদ্রলোকের বিচিত্র ব্যাপার দেখে ডাক্তার বাবুর কাছে জানতে চাইলেন এদের মাথা খারাপ হল কীভাবে আর ওই যে জপমালাই বাকে? ডাক্তার বাবু যা বললেন অতিশয় চমকপ্রদ ভুতনাথ বাবু জপমালা নামে এক মহিলার প্রেমে পড়ছিলেন। তারপর প্রেমে ব্যর্থ হয়ে জপমালা দেবীকে বিয়ে করতে না পেরে এই রকম হয়েছেন। এই পর্যন্ত শুনে পরিদর্শক মহাশয় সরলভাবে বললেন এই দেবনাথ বাবু উনিও প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ওই একই জপমালা পালকে জীবনে না পেয়ে সারাদিন জপমালা জপমালা জপে যাচ্ছেন। ডাক্তার বাবু মৃদু হেসে বললেন, ‘না। আসল ব্যাপার ঠিক এর উল্টো। দেবনাথবাবু প্রেমে সফল হয়ে জপমালা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন। ঘটনাবলি দু’জনের ক্ষেত্রে দু’রকম ফল দিয়েছে। ভুতনাথবাবু জপমালা দেবীকে না পেয়ে পাগল হয়ে গেছেন, আর দেবনাথ বাবু জপমালা দেবীকে পেয়ে পাগল হয়ে গেছেন।সুতরাং কী কারণে কার মনে কখন কী হয়, কেউ বলতে পারে না। এ বিষয়ে আমি আগে অনেক লিখেছি। আমারও আর কিছু বলার নেই। শুধু চর্বিত চর্বণে গরুর মতো জাবর কেটে কী লাভ! সব শেষে সেই ভদ্রলোককে মনে পড়ছে খেয়াল করতে পারছি না তাঁর কথা এই শেষ মেলেও লিখে ফেলেছি কিনা। পাঠক পাঠিকা আমার অনুরূপ একশ আটটি দোষ ক্ষমা করেছেন নিশ্চয় এর পরেও ক্ষমা করবেন। খুব ছোট করে বলছি, আমার এক অতি পরিচিতি খ্যাপা প্রতিবেশি গোপালবাবু সেদিন আমাকে বলেছিলেন মি: কামাল আমার নাম যদি গোপাল না হত তাহলে কী বিপদ হতো? আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম কী বিপদ? তিনি জবাব দিয়েছিলেন আপনারা সবাই আমাকে গোপাল বলেন, আমার নাম যদি গোপাল না হতো তা হলে কী হতো? এই গোপালবাবু মানসিক সমস্যা গুলি অতি বিচিত্র। তিনি খুব আইসক্রিম ভালোবাসেন। তার মন চায় আইসক্রিম খেতে। একদিকে আবার তার অসুখের এই বুঝি কোনও মারাত্মক ব্যাধি সংক্রমিত হল। আবার আইসক্রিমের লোভও ত্যাগ করতে পারেন না। অবশেষে তিনি নিজেই একটা মধ্যবর্তী সমাধান বার করেছেন। বাজার থেকে আইসক্রিম কিনে এনে আজকাল ফুটিয়ে খাচ্ছেন। কিন্তু এতো তবু ভাল, একদিন সকাল বেলা বাসায় যখন চা খেতে বসেছি হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে গোপালবাবুর চিৎকারে চায়ের পেয়ালা ফেলে ছুটে গেলাম। কী ব্যাপার? আজ কিছুদিন হল গোপালবাবুর মারি ফোলা। দাঁতের গোড়া দিয়ে রক্ত পড়ছে। তিনি সন্ধ্যাবেলা দাঁতের ডাক্তার দেখিয়েছেন। ডাক্তার বাবু তাকে কয়েকদিন টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজতে বারণ করেছেন। বলেছেন আঙ্গুল দিয়ে দাঁত মাজতে। কিন্তু হাতের আঙ্গুলে তো কত রকম জীবাণু অদৃশ্য ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থাকতে পারে বিশেষ করে নখের কোণে, সুতরাং মোক্ষয় পথ বেচে নিয়েছেন গোপালবাবু। দাঁত মাজা নিজের ডান হাতের তর্জানটা জীবাণু মুক্ত করার জন্য টগবগে গরম জল চরিয়েছেন এবং তারই তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া এই আর্তচিৎকার।
আমি গিয়ে দেখলাম জীবনবাবুর আঙ্গুলে মুহূর্তের মধ্যে বিশাল ফোসকা পড়ে গেছে আর তিনি তর্জনী মাথার ওপরে তুলে লাফাচ্ছেন। জীবনবাবু লাফাতে থাকুন। ততক্ষণে এই নিবন্দ্ব শেষে আপনাদের একটা উপদেশ দিচ্ছি।
পাগলকে হেলাফেলা করবেন না, বিপদ হতে পারে। কফিহাউজের দরজায় এক বলবান পাগল কাউকে ঢুকতে কিংবা বেরতে দেখলে দুটো টাকা চাইত একজনের কফি খাওয়ার জন্যে। এক সদয় ভদ্রলোক তাকে দশ টাকার একটা নোট দিয়েবলেছিলেন‘এক কাপ কেন, আপনি পাঁচ কাপ কফি খান এই টাকা দিয়ে।’ পরের দিন সেই সদয় ভদ্রলোক যখন আবার কফিহাউজে ডুকছেন সেই বলবান পাগল এক ঘুষি মেরে তাঁকে চিত করে ফেলে দিল। হতবাক এবং মর্মাহত ভদ্রলোক কিছুই না বুঝতে পেরে সিঁড়ির ওপর থেকে গায়ের ধুলো ঝেড়ে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? কাল দশ টাকা দিয়েছিলাম। এই বুঝি তার প্রতিদান?
পাগল তখন গজরাচ্ছে, গজরাতে গজরাতে সে বলল, ‘শালা, তোর জন্য পাঁচ কাপ কফি খেয়ে কাল সারারাত আমার ঘুম হয়নি।
পুনশ্চ: এ গল্পটা তো সবাই জানেন তবু আবার বলি। মানসিক চিকিৎসালয়ে এক
ভদ্রলোক গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, আপনাদের এখান থেকে কি আজকালের মধ্যে কোনও পাগল পালিয়েছে?
চিকিৎসালয়ের লোকেরা অবাক হয়ে বলেছিল, ‘কই না তো।’ কিন্তু আপনি হঠাৎ আমাদের এখানে এসে এ প্রশ্ন করছেন কেন? এই প্রশ্ন শুনে ভদ্রলোক বললেন, ‘বাসায় গিয়ে শুনলাম আমার স্ত্রী যেন কার সঙ্গে পালিয়েছে। কিন্তু পাগল ছাড়া আর কে আমার বউকে নিয়ে পালাবে, তাই খোঁজ করতে এলাম। সত্যি সত্যি আমার মনের কথা হলো দেশের স্বপক্ষে কাজ করতে চাই। দেশের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি , টেন্ডারবাজি, হত্যা- রাহাজানি, প্রশাসনের গ্রেফতার বাণিজ্য সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, সর্বনাশা মাদক থেকে কোমলমতি ছেলে সন্তানদেরকে রক্ষা করা, যথাযথ নিয়মে পাঠকদের জন্য তথ্য নির্ভর লেখালেখি এবং যেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে পত্রিকায় লেখা হবে সেই লেখা যেন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা মনোযোগ দিয়ে পড়েন। তার জন্য তাদেরকে পত্রিকার সমস্যা বিষয় লেখা গুলো মনোযোগী হওয়ার অনুরোধ করা লেখা গুলো পড়ে যেন সমস্যা সমাধান করেন যদি সমস্যা সমাধানের পড়া থেকে বিরত থাকলে তাদেরকে কি করব তা মনে কথাটা বলে দেওয়া আপাদৎ আমার এই পর্যন্ত মনের কথা। সত্য কথা তিতা, সার কথার ধার বেশী, কথার নাম লতা, কথায় হারে কথায় মরে, কথায় জয় কথায় ক্ষয়, কথাজীবিরা কথা বলে। ব্যবহারজীবি কথাজীবি একই পেশার মানুষ রাজনীতিবীদরা বেশী কথা বলে তবে তারা কথা দিয়ে কথা রাখে না কারণ তাদের কথা মনের কথা নয়। মনের কথা কিন্তু সবাই প্রকাশ করতে পারে না। বাদশাহ কোন কারণে পন্ডিত নাসির গাজীর উপর অসন্তুষ্ট হলেন। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁকে জব্দ করবেন। বাদশাহ নাসির গাজীর প্রশংসায় সর্বদা পঞ্চমুখ থাকতেন নাসির গাজী বিনে দরবার তাঁর কাছে নিরাস মনে হত।
কিন্তু কথায় আছে “বেশি প্রীতি বিষম জ্বালা,” তাই কোন এক কারণ বশত তাঁর ওপর বাদশা অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত ও হন খুব। বাদশাহ নাসির গাজীর উপর মনক্ষুন্ন হলে সবচেয়ে খুশি হন উজির সাহেব। কারণ বাদশাহ নাসির গাজির প্রশংসা করলে বা তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করলে উজিরে পিত্ত জ্বলে উঠত। তাছাড়া বেশ কয়েকবার নাসির গাজীরকে জব্দ করতে গিয়ে তিনি নিজেই ফেঁসে গিয়েছেন। যাই হোক, নাসির গাজীকে জব্দ করার জন্য বাদশাহ রাজ্যময় ঘোষণা করে দিলেন, যে ব্যক্তি বাদশাহর মনের কথা বলে দিতে সক্ষম হবে। বাদশাহ তাকে এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা পুরষ্কার দিবেন। বাদশাহ নিশ্চিত ছিলেন যে এরকম ঘোষণার পর একমাত্র নাসির গাজীর এগিয়ে আসার সাহস রাখবে। তিনি ভেবে রেখেছেন। নাসির গাজি কখনও তাঁর মনের কথা বলতে পারবে না। আর একান্ত কাকতালিয়ভাবে বলে দিলেও তা ধর্তব্য হবে না। কেননা নাসির গাজী যাই-বলুক কিন্তু তিনি এ কথা তাঁর মনের কথা বলে স্বীকার করবেন না। সুতরাং নাসির গাজী জব্দ হবেই। ঘোষণার পর এ নিয়ে রাজ্য জুড়ে দু একদিনে খুব হৈ চৈ হল। অবশেষে ব্যাপারটা অসম্ভব এবং রাজার খেয়াল ভেবে রাজ্যের পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো নাসির গাজী, এসময় সফরে ছিলেন। ফিরে এসে সব খবর শুনে মুচকি হাসলেন তৎক্ষণাত রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে বাদশাহকে বললেন বেয়াদবি মাফ করবেন। আমি আপনার মনের কথা বলে দিতে সক্ষম। বাদশাহ গত দুইদিন নাসির গাজীর অপেক্ষায় ভেবেছেন। চালাক নাসির গাজী নিশ্চয় তাঁর মনের ভাব বুঝে নাসির গাজীকে দেখে এবং তাঁর কথা শুনে খানিকটা অপ্রস্তুত হলেন। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণে দৃঢ় কন্ঠে বললেন ঠিক আছে ঠিক আছে। তবে আমার মনে কথা একটি নয় বরং দুটি বলতে হবে। নাসির গাজীর মুখাবয়বে কোন পরিবর্তন আসলো না। তিনি পূর্বের সেই স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলেন। তাতেই আমি সক্ষম হব। বাদশা বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে এখন নয় আগামীকাল রাজদরবারে জনসম্মুখে তোমার কথা শুনব। পরদিন রাজদরবারে উপচেপড়া ভির। তিল ধারনের মত ঠাই নেই কোথাও। বাদশাহ স্বীয় সিংহাসনে উপবিষ্ট। উজির এবং মন্ত্রী পরিষদ স্ব স্ব পজিশন অনুসারে আসীন। বাদশার নিদের্শে নাসির গাজী, উঠে দাঁড়ালেন। চারদিকে একবার চেয়ে নিয়ে আস্তে ধীরে বললেন জাঁহাপনার আপনার মনের কথা দু’টি। একটি হল “আল্লাহ তাআলা এক এবং তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই”। নাসির গাজী থামলে সমস্ত দরবারে ফিসফিসানি শুরু হল। আর বাদশাহ দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে হয়রান হয়ে বললেন, তুমি সঠিক বলেছ গাজী। তো এবার অন্যটি কী? বলো, নাসির গাজী আড়চোখে একবার উজিরকে দেখে নিয়ে বললেন, আর দ্বিতীয় যে কথাটি জাঁহাপনার বিশাল হৃদয়রাজ্যে জায়গা করে নিয়েছে। তা হচ্ছে- জনগণের কল্যাণ কামনা এবং সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে রাজ্য পরিচালনা করার ব্রত। বাদশাহ এবারও কিছুক্ষণ ভাবলেন কিন্তু হয়রান হলেন না, বরং মৃদু হাসলেন দীপ্ত উজ্জ্ল হয়ে উঠল তাঁর মুখমণ্ডল। গর্বে বুক ফুলে গেল। ভাবলেন এমন বুদ্ধিমান ও দুরদৃষ্টিসম্পর্ণ মানুষ তাঁর রাজ্যের আছে। বাদশা উঠে দাঁড়িয়ে নাসির গাজীর সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী একলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন। এদিকে উজিরের অবস্থা তখন সহজেই অনুমেয়। চোখে তিনি সর্ষের ফুল দেখলেন। নাসির গাজীর হাতে এই মুদ্রা দেখে এ অসম্ভব বলে আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। বাদশাহ তাঁর দিকে ফিরে বললেন কি হে উজির সাহেব কী অসম্ভব? উজির স্বীয় উচ্ছাস চেপে রেখে আমতা আমতা করে বললেন, বেটা কি জানি কিভাবে আপনার মনের কথা বলে ফেলেছে। বলছিলাম আপনি অনুমতি দিলে বাদশাহ বললেন থামলেন কেন নিদ্বিধায় বলে ফেলুন, আজ আর কোন অনুমতির প্রয়োজন হবে না।
উজির এবার পূর্ণ আক্রোশের সাথে বললেন, “জাঁহাপনা! বলছিলাম- উনি যদি আমার মনে কী আছে বলতে পারেন, তাহলে এই আমি ওয়াদা করছি, উনাকে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেব।”
বাদশাহ নাসির গাজীর প্রতি উজিরের বিরূপ মনোভাব সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এখন তার কথা শুনে বেশ কৌতুহলবোধ করলেন। মৃদু হেসে নাসির গাজীকে বললেন, “কি হে গাজী“ উজির সাহেবের মনের গোপন কথা বলতে পারবে তো”?
নাসির গাজী ততক্ষণে বাদশাহ প্রদত্ত এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দ্বারা পকেট পূর্ণ করে ফেলেছেন। মাথা তুলে বললেন, “ অধম জাঁহাপনার অনুমতি প্রত্যাশী।” বাদশাহ বললেন, আগেই বলেছি- “ আজ কোন অনুমতি প্রয়োজন নেই।”
নাসির গাজী মুখে গাম্ভীর্য ফুটিয়ে সুস্থিরভাবে বললেন, “মহামান্য উজির সাহেবের মনের লুকানো কথা হলো- তিনি জাঁহাপনার দীর্ঘায়ু কামনা করেন। এও কামনা করেন- যেন শান্তিপূর্ণভাবে রাজ্য পরিচালিত হয়।”
নাসির গাজীর থামার পর রাজদরবারে আবারও মৃদু গুঞ্জন উঠল। বাদশাহ অনেক কষ্টে স্বীয় হাসি চেপে রাখলেন। তিনি এরকম কিছুই ভাবছিলেন।
এদিকে উজিরের অবস্থা অবর্ণনীয়। তিনি ফুটো বেলুনের মত চুপসে গেলেন। অসহায়ভাবে বাদশাহর দিকে তাকাতে লাগলেন। বাদশাহ তার অবস্থা অবলোকন করে বললেন, উজির সাহেব! নাসির গাজীর প্রতি বিরূপ মনোভাব জিইয়ে রাখা আপনার জন্য আমি অমঙ্গল মনে করি। কি বলেন? তারপর নাসির গাজীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার বুদ্ধিমত্তায় আমি যার পর নাই খুশি হয়েছি। তাই উজির সাহেবের ৫০ হাজারের সাথে আরো ১ লক্ষ ৫০ হাজার যোগ করে স্বর্ণমুদ্রা মোট দুই লক্ষ করার অঙ্গীকার তোমাকে দিলাম। পণ্ডিত নাসির গাজী কিন্তু অপরের মনের কথা বলতেন। কিন্তু আমি আমার মনের কথা প্রকাশ করছি। তাই পাঠকদের সুবিধার্তে আমার মনের কথা তুলে ধরছি।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক- যুগ্ম সম্পাদক –
দৈনিক ভোরের আওয়াজ ও The Daily banner-