কক্সবাজারে ৩২ জনের মৃত্যু, সুপেয় পানি ও খাদ্য সংকট!
নেমে যাচ্ছে বন্যার পানি, কাটেনি দুর্ভোগ
কক্সবাজারে ৩২ জনের মৃত্যু, সুপেয় পানি ও খাদ্য সংকটে দুর্গত মানুষ
এইচ, এম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার:
টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত কক্সবাজারে অবশেষে স্বস্তির আভাস মিলতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় জেলার প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে ধীরে ধীরে বন্যার পানি নামছে। তবে পানি কমলেও কাটেনি মানুষের দুর্ভোগ। ঘরবাড়ি, আঙিনা ও নিচু এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে সুপেয় পানি, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীর সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন হাজারো দুর্গত মানুষ।


টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে সৃষ্ট এই দুর্যোগে এ পর্যন্ত জেলায় পানিতে ডুবে এবং মাটিচাপায় ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোববার (১২ জুলাই) বিকেলের পর থেকে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, রামু, মহেশখালী, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করে। অনেক এলাকায় প্রধান সড়কগুলো পানিমুক্ত হলেও অধিকাংশ বসতবাড়ি, উঠান ও গ্রামীণ সড়কে এখনো জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে। সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে কক্সবাজারের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও নতুন করে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বে জারি করা সতর্ক সংকেত প্রত্যাহার করেছে। একই সঙ্গে সমুদ্র ও নদী শান্ত থাকায় জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার নৌপথে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলও স্বাভাবিক হয়েছে। কয়েকদিন ধরে ঘাটে আটকে থাকা ট্রলার ও স্পিডবোটগুলো সোমবার সকাল থেকে আবার যাত্রী নিয়ে চলাচল শুরু করেছে। পেকুয়া এলাকার সাকিব হাসান জানান, পানি নেমে যাচ্ছে, তবে আক্রান্ত এলাকায় চরম বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়েছে।
এদিকে পানি নামতে শুরু করায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে। অসংখ্য ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি সরে গেলেও কাদামাটি পরিষ্কার এবং ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছেন বাসিন্দারা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকার মানুষ। এসব এলাকায় সুপেয় পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে দাবি স্থানীয়দের। চকরিয়ার কাকারা এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন রনি বলেন, তিন দিন পানিবন্দি ছিলাম। এখন পানি কমলেও এলাকায় সুপেয় পানি ও খাবারের সংকট রয়েছে। হতদরিদ্র মানুষ খুব কষ্টে দিন পার করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, সরকারিভাবে যে ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্গত এলাকায় আরও বেশি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।
তবে এ অভিযোগ নাকচ করে জেলা প্রশাসনের দাবি, প্রতিটি উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পর্যাপ্ত চাল, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ি নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। তবে জোয়ারের সময় পানি নিষ্কাশনের গতি কিছুটা কম থাকায় লোকালয়ের জলাবদ্ধতা পুরোপুরি কাটতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।
রোববার চকরিয়ায় ত্রাণ বিতরণকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষ সরকারি সহায়তা পাবে। পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ না কমা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। এজন্য যত বরাদ্দ প্রয়োজন, সরকার তা নিশ্চিত করবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন, অবকাঠামো সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্গঠনে সরকার প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় আড়াই লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন। জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের জন্য ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।