কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৫!
বন্যা ও পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৫ : আহত অর্ধশত:নিখোঁজ ২: রেল ও নৌ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
(সর্বশেষ আপডেট)
এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার
কক্সবাজার ও পার্শবর্তী অঞ্চলে টানা ৬ দিবারাত্রি ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলার মাতামুহুরি, বাঁকখালী, ফুলেশ্বরী, কোহেলিয়া, রেজু ও নাফনদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে ফসলি জমি, পুকুর, চিংড়ি ঘের, সড়ক, রেলপথসহ বিস্তৃর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।বিশেষ করে কক্সবাজার শহর ও মাতারবাড়িতে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে খাল, ছড়া বন্ধ থাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সর্বশেষ ৯ জুলাই চকরিয়ার বরইতলীতে মাটি চাপা পড়ে নিহত হয়েছে দুই শিশু। বসতবাড়ির উপর আস্ত পাহাড় ্ধ্বসে পড়লে ঘুমন্ত অবস্থায় দুই শিশু মাটির নীচে চাপা পড়ে।এসময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা জেগে উঠে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় দুই জনের লাশ উদ্ধার করে।বৃহস্পতিবার বরইতলী মোহছনিয়া কাটা পাহাড়ি গ্রামে এই দূর্ঘটনা ঘটে।নিহত দুই শিশু হচ্ছে মোহাম্মদ কাজলের কন্যা রূমি আকতার (১৫) অপর শিশু আবদুল মজিদের ছেলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র মোহাম্মদ তৌসিফ( ১০)
এর আগে
বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাব-ব্লক এ-৩ এর খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় পাহাড়ধসের ঘটনায় ৮ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এতে টানা বৃষ্টিতে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে এসে দাড়িয়েছে।
নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন- কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩) এবং আব্দুস শুক্কুরের দুই মেয়ে উম্মে নেজাতুল (১৩) ও উম্মে সালমা (১২) এবং মোহাম্মদ ইলিয়াসের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)। বাকি নিহত ৪ জনের নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার ত্রাণ ও শরনার্থী কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ক্যাম্প-৫-এ সংঘটিত ভূমিধসের ঘটনায় সর্বমোট ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়। এদের মাঝে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৮ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এদের মাঝে চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং অন্য চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
এ নিয়ে গত ৬ দিনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের ঘটনায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর কক্সবাজার সদর ও বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড় ও দেয়াল ধস এবং পানিতে ডুবে মারা গেছেন পাঁচজন। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পাহাড় ধস আতংক সবাইকে তাড়া করছে।
দুর্ভোগে পড়া লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা জানান, মঙ্গলবারের সারাদিনের ভারী বর্ষণে মাতামুহুরি, ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী, কক্সবাজার শহরের পাশদিয়ে বয়ে যাওয়া বাঁকখালীসহ ছোট-বড় সকল নদী-খালে পাহাড়ি ঢল নেমেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে সমতলে পড়া বৃষ্টির পানি। সাগর উত্তাল ও ঝড়োহাওয়া অব্যাহত থাকায় জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩/৪ ফুট বেড়ে যাওয়ায় উপকূল-সমতলে জমে থাকা পানি অত্যন্ত ধীর গতিতে নামছে।ফলে পানি নামতে বেগ পেতে হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে পানি লোকালয়ে জমে দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। কক্সবাজার সদরের পিএমখালী, বাংলাবাজার, খরুলিয়া, খুরুশকুল,দক্ষিণ মিটাছড়ি, চৌফলদন্ডী, ভারুয়াখালী, রামুর ফতেখাঁরকুল, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, গর্জনিয়া, খুনিয়াপালং, ঈদগড়, মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, রশিদনগর, উখিয়ার হলদিয়াপালং, রাজাপালং, রত্মাপালং, পালংখালী, জালিয়াপালং, ঈদগাঁও সদর, ইসলামপুর, ইসলামাবাদ, পোকখালী, জালালাবাদ, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, বমু বিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।
একইভাবে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া,বদরখালী কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়েছে পেকুয়ার নিম্নাঞ্চলও।
জানা গেছে, প্লাবিত এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আমনের বীজতলা, সবজিখেত এবং চিংড়ির ঘের পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
অপরদিকে, টানা ভারী বর্ষষে কক্সবাজারে পাহাড় ও বাড়ির দেয়াল ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা ও স্থানীয় মিলিয়ে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।আহত হয়েছে কমপক্ষে ৫০ জন। পরিস্থিতি বিবেচনায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাফিস ইনতেসার নাফি অভিযান টিম নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে উঠে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার তাগাদা দিচ্ছেন। সদরের কলাতলীর হাজীপাড়ায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে বুধবার দুপুরের পর থেকে বিশেষ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা হয়। ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করলেও অনেকে শুনতে চাচ্ছেন না। বুঝিয়ে ওনাদের সরানো হচ্ছে।

একইভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছেন, কক্সবাজারের অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও। ঝুঁকি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হলেও বেশিরভাগই নড়াচড়া করতে নারাজ। এমন অনেক পরিবারকে ফোর্স করেই আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। যেকোন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সকল আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রামুর খুনিয়াপালংয়ের ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হক বলেন, আষাঢ়ের টানা বৃষ্টি এলাকার চারপাশ ডুবিয়ে রেখেছে। যেখানে সড়ক একটু নিচু তা পানিতে তলিয়ে থাকায় চলাচল ব্যহত হচ্ছে। ঘরবন্দী হয়ে আছেন গ্রামের সিংহভাগ মানুষ। নেহায়েত প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হচ্ছেন না। এতে শ্রমজীবী পরিবারগুলো দুর্ভোগে পড়ছে।
ঈদগাঁও উপজেলার সাংবাদিক আশফাক উদ্দীন আরাফাত বলেন, এবারের বর্ষণ পাহাড়-সমতল-উপকূল সবাইকে সমানতালে ভোগাচ্ছে। অতীতে আমাদের ঘরে কখনো পানি উঠেনি। কিন্তু এবারে আমাদের ঘরেও হাঁটু সমান পানি উঠেছে। ঈদগাঁও বাজারে অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যবসায়ীরা।
চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা বায়জীদ বলেন, বৃষ্টি থামলেই মনে হয় পানি নামবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। রাস্তাঘাটে হাঁটুসমান পানি, চলাচল খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
মাতামুহুরীর সাহারবিল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মহসিন বাবুল বলেন, আমনের বীজতলা ও সবজিখেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফসলের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছি।
চকরিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র আলমগীর বলেন, বৃষ্টির কারণে বাসা হতে বের হওয়া দুরূহ। শ্রমজীবীরা কাজে যেতে না পেরে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, দুই উপজেলার বেশ কিছু এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর জেনেছি। পাহাড়ে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে।
ইউএনও আরও জানান, উজানের পানি দ্রুত নামাতে উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর পানি নিষ্কাশনের স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ প্রস্তুত।
তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে জেলার ৯টি উপজেলার অন্তত৪১টি ইউনিয়ন। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের। পানিবন্দি হয়েছেন অন্তত এক লাখ মানুষ। ব্যাহত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ। বন্ধ রয়েছে কয়েকটি নৌপথ। বিশ্বের বৃহৎ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তৈরি হয়েছে মানবিক সংকট।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১০৩ মিলিমিটার, মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১২৯ মিলিমিটার, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৭৭ মিলিমিটার এবং আরও আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। চারদিনে মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ৭৪৯ মিলিমিটার, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।
তিনি বলেন, অল্প সময়ে এমন অতিভারী বৃষ্টিপাত পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে এখনো ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের অন্তত ১১ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে আরও ২-৩ দিন ভোগান্তি থাকবে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, ক…