টানা বৃষ্টিতে কয়েকদিনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬
উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদ্রাসার ওপর পাহাড়ধস আট ছাত্রী নিহত, আহত ৫
টানা বৃষ্টিতে কয়েকদিনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬
নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার
টানা অতিবৃষ্টির কারণে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি মাদ্রাসার ওপর পাহাড়ধসে আট ছাত্রী নিহত হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে চারজন ঘটনাস্থলেই এবং আরও চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আহত পাঁচ শিশুকে বিভিন্ন ক্যাম্পের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর এ-৭/৩ ব্লকে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, পাহাড়ধসের পর উদ্ধার হওয়া ১৩ শিশুর মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত পাঁচজনকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে (GK) হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি (IRC) হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে এবং ক্যাম্প কো-অর্ডিনেশন অ্যান্ড ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট (CCCM) স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়। এপিবিএন (APBN) সদস্যরা ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং আরআরআরসি কর্মকর্তারা পুরো উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন। উদ্ধার অভিযান ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা কাজ করছেন। পাহাড়ধসে আনুমানিক ৩০ শিক্ষার্থী চাপা পড়ে আছে।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদেক জানান, ঘটনাস্থলে মেয়েদের একটি মাদ্রাসা এবং তার ওপরে একটি মক্তব ছিল। মাটি ভরাট করে নির্মিত মাদ্রাসাটির পাশের পাহাড় টানা বৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পাহাড়ের ঢাল ধসে ভবনটির ওপর পড়ে এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাতে উখিয়ার তিনটি পৃথক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আটজন নিহত হন। রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড়ধসে নিহত হন মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। একই রাতে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে নিহত হন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩)।
নতুন এই দুর্ঘটনায় গত কয়েকদিনে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “মানবিক সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।” এদিকে একই সময়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার সাত্তারঘোনা, পেকুয়া এবং পরদিন দরিয়ানগর এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সমুদ্রবন্দরসমূহে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রতিকূল আবহাওয়া আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। রোহিঙ্গা মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন, উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। হিফজ খানার ভেতরে আরও অনেকে আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার সব সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সহায়তার জন্য ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত আটজনের লাশ উদ্ধারের কথা জানতে পেরেছি। উদ্ধার কাজ চলছে, তবে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।”