1. news@bbcnewsbd.com : BBC NEWS BD : BBC NEWS BD
  2. info@www.bbcnewsbd.com : BBC NEWS BD :
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ:

শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
  • প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে



শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তার প্রকৃত পরীক্ষা শুধু জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে নয়, জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হয়। একজন নাগরিক রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন তার নিজের ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা কিংবা পৌর এলাকার সেবা পাওয়ার মধ্য দিয়ে। রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, স্থানীয় বাজার, নাগরিক সেবা, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পথচারী নিরাপত্তা কিংবা স্থানীয় অবকাঠামো, এসব বিষয় সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। আর এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা যত বেশি, জনগণের কাছে রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতাও তত বেশি।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোট ১২ নভেম্বর থেকে শুরু হতে পারে। পরবর্তী ধাপগুলোও পর্যায়ক্রমে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তবে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামতের পর সময়সূচি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

নির্বাচন আয়োজনের এই উদ্যোগ শুধু একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, এটি দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে সক্রিয় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কারণ একটি ইউনিয়ন পরিষদ কেবল চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি গ্রামীণ জনগণের দৈনন্দিন নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসম্পৃক্ত প্রশাসনের অন্যতম প্রধান স্তর। তাই এই নির্বাচন যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভোট দেওয়ার জন্য, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যকর, সৎ, দায়িত্বশীল ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার গঠনের জন্য।

তবে নির্বাচন হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সুষ্ঠু নির্বাচন একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারের প্রথম শর্ত মাত্র। নির্বাচনের আগে যেমন প্রার্থীদের আচরণ, প্রচার ও অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ভোটের দিন ভোটারের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রার্থী যাতে ভয়ভীতি, প্রভাব, অর্থবল, পেশিশক্তি কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারেন, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো ভোটার যেন নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কারণে হয়রানি বা চাপের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে শুধু স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে। জাতীয় রাজনীতির বাইরে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সবচেয়ে কাছের জায়গাগুলোর একটি হলো স্থানীয় সরকার। এখানে একজন ভোটার তার এলাকার রাস্তা, পানি, ড্রেনেজ, বাজার, সড়ক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা সামাজিক সমস্যার বিষয়ে যিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, তাকে নির্বাচিত করেন। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা বা সাময়িক আবেগের পাশাপাশি প্রার্থীর সততা, দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, দায়িত্বশীলতা এবং এলাকার উন্নয়ন সম্পর্কে বাস্তব ধারণাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এখানেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি শুধু নির্বাচন চাই, নাকি কার্যকর স্থানীয় সরকারও চাই? যদি দ্বিতীয়টি চাই, তাহলে নির্বাচনের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার বাস্তব পরিধি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা হলো দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে অসামঞ্জস্য। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক দায়িত্ব রয়েছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, দক্ষ জনবল, কারিগরি সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে নেই।

একটি ইউনিয়ন পরিষদকে রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অবকাঠামো কিংবা নাগরিক সেবা নিয়ে কাজ করতে বলা হলো। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ নেই, কারিগরি জনবল সীমিত, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্য দপ্তরের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। তখন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ জনপ্রতিনিধিরাও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন না। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও স্থানীয় সরকারের সক্ষমতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি জবাবদিহির কাঠামোগত সংকট। কারণ জনগণ যার কাছে অভিযোগ করছেন, তার হাতে যদি সমস্যার সমাধানের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকে, তাহলে জবাবদিহির কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই দায়িত্বের সঙ্গে ক্ষমতা এবং ক্ষমতার সঙ্গে সম্পদ দিতে হবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের সব সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে নেওয়া সম্ভব নয়, আবার বাস্তবসম্মতও নয়। একটি ইউনিয়নের সমস্যা আর একটি মহানগরের সমস্যা এক নয়। নদীভাঙন প্রবণ এলাকার পরিকল্পনা, উপকূলীয় এলাকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা এবং শহরের জলাবদ্ধতা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এক পদ্ধতিতে পরিচালনা করা যায় না। স্থানীয় মানুষের সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সবচেয়ে ভালোভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। তাই জাতীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় পর্যায়ে দিতে হবে। তবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ মানেই জবাবদিহি কমে যাওয়া নয়। বরং ক্ষমতা যত বাড়বে, জবাবদিহিও তত শক্তিশালী হতে হবে। স্থানীয় সরকারকে অর্থ দেওয়া হবে, কিন্তু সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হলো, কাজের মান কেমন হলো, জনগণ কী পেল এবং কোনো অনিয়ম হলে দায় কার, তার স্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে।

প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট, প্রকল্প, বরাদ্দ, ব্যয়, কাজের সময়সীমা ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করা যেতে পারে। প্রকল্পের তথ্য স্থানীয় কার্যালয় ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। শুধু হিসাবের খাতায় অর্থ ব্যয়ের তথ্য থাকলে হবে না। জনগণকে জানতে হবে তাদের এলাকার উন্নয়নে কত টাকা এসেছে, কোথায় খরচ হয়েছে এবং সেই ব্যয়ের বিনিময়ে কী অর্জিত হয়েছে। কারণ ‘অর্থ বরাদ্দ হয়েছে’ কোনো উন্নয়নের সাফল্যের প্রমাণ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সেই অর্থের বিনিময়ে জনগণ কী পেলেন। একটি রাস্তা নির্মাণ করে কয়েক মাস পর সেটি নষ্ট হয়ে গেলে সেটি উন্নয়ন নয়। একটি ড্রেন নির্মাণ করে সেটি নিয়মিত পরিষ্কার না করলে জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকেই যাবে। তাই স্থানীয় সরকারের কর্মদক্ষতা প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে নয়, মানুষের জীবন কতটা সহজ হয়েছে তা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও নিজেদের ভূমিকা নতুনভাবে দেখতে হবে। চেয়ারম্যান বা সদস্য হওয়া কোনো ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়, এটি জনগণের দেওয়া একটি দায়িত্ব। নির্বাচনের পর যারা জয়ী হবেন, তাদের কাছে দল-মত, আত্মীয়তা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে সব নাগরিক সমান গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখেন। কোনো ইউনিয়ন পরিষদ যেন নির্বাচিত কয়েকজনের ব্যক্তিগত প্রভাবের কেন্দ্রে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

নির্বাচনের পর পরাজিত প্রার্থীদেরও নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে স্থানীয় উন্নয়ন ও জনস্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করে, কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর জনগণের স্বার্থে সহযোগিতার জায়গা তৈরি করতে হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি নির্বাচনের পরও বিভাজন, প্রতিহিংসা ও বিরোধে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো ইউনিয়নের মানুষ।

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে পারস্পরিক সৌহার্দতার সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। প্রচারে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। কে কী করবেন, কীভাবে করবেন, কত সময়ে করবেন এবং সেই কাজের জন্য কী ধরনের সম্পদের প্রয়োজন, প্রার্থীদের কাছ থেকে এসব বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য আশা করা স্বাভাবিক। জনগণেরও উচিত শুধু প্রতিশ্রুতি শোনা নয়, প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড, সামাজিক ভূমিকা, সততা ও সক্ষমতা বিবেচনা করা।

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের মাঠ প্রশাসন, রিটার্নিং কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের মাধ্যমে নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই কাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল হতে পারে।

আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। স্থানীয় নির্বাচন অনেক সময় ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা উত্তপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নির্বাচন কমিশনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসেছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।

তবে নিরাপত্তা মানে শুধু ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন নয়। ভোটার যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারেন, নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটার যাতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান, ভোটকেন্দ্রে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যেন পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন এবং ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশে স্বচ্ছতা থাকে, সবকিছুই নিরাপদ নির্বাচনের অংশ।

একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গুজব, মিথ্যা তথ্য বা উসকানিমূলক প্রচারণা যেন নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতাও থাকতে হবে।

স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা। একটি ইউনিয়নে কোথায় রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় জলাবদ্ধতা হয়, কোথায় নিরাপদ পানির সংকট, কোথায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা, কোন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল, কোথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার থাকলে প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা সহজ হবে।

সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও ইউনিয়ন পর্যায়ে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। গ্রামের বাজার, স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, অপর্যাপ্ত আলো, পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা, অবৈধ দখল কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় সরকার এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সমন্বয় করতে পারে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা শুধু চালকের দায়িত্ব নয়; রাস্তার নকশা, ব্যবস্থাপনা, পথচারী নিরাপত্তা এবং স্থানীয় ভূমি ব্যবহারের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধেও স্থানীয় পর্যায়ে নতুন সংস্কৃতি প্রয়োজন। শুধু দুর্নীতির অভিযোগ তুলে লাভ নেই, এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে অনিয়ম করা কঠিন হয়। ডিজিটাল দরপত্র, প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ, কাজের মান যাচাই, নিয়মিত নিরীক্ষা, নাগরিক পর্যবেক্ষণ এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি কার্যকর করা প্রয়োজন। অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায় নির্ধারণ ও শাস্তির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি যদি শুধু কাগজে থাকে, তাহলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে শুধু ভোটের দিন হিসেবে দেখা যাবে না। ভোটের দিন থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পর্কই প্রকৃত স্থানীয় গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করবে। নির্বাচনের আগে প্রার্থী জনগণের কাছে যাবেন, নির্বাচনের সময় ভোটার তার মতামত দেবেন, আর নির্বাচনের পরে নির্বাচিত প্রতিনিধি জনগণের কাছে হিসাব দেবেন, এই ধারাবাহিকতাই স্থানীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি।
এ কারণে নির্বাচন কমিশনের বর্তমান উদ্যোগকে শুধু নির্বাচন আয়োজনের প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে স্থানীয় সরকার পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা দরকার। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হলে জনগণের আস্থা বাড়বে। জনগণের আস্থা বাড়লে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বও বাড়বে। আর দায়িত্বের সঙ্গে ক্ষমতা, অর্থ, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় সরকার বাস্তব অর্থেই শক্তিশালী হবে।

আমরা এমন নির্বাচন চাই, যেখানে ভোটার ভয় ছাড়া ভোটকেন্দ্রে যাবেন, প্রার্থী অন্যায় প্রভাব ছাড়াই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং ফলাফল নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি কমিশনের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, প্রতিটি ধাপে আইন ও বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও প্রত্যাশা থাকবে, তারা কোনো পক্ষের নয়, রাষ্ট্র ও ভোটারের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে দায়িত্ব পালন করবে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সমর্থক ও ভোটারদেরও মনে রাখতে হবে, একটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন কোনো ব্যক্তিগত যুদ্ধ নয়। এটি একটি এলাকার আগামী দিনের নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া। এখানে জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় হলো জনগণের অধিকার এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা। শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাই প্রথম প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। এরপর প্রয়োজন যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব, পর্যাপ্ত অর্থ, বাস্তব ক্ষমতা, দক্ষ জনবল, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং কঠোর জবাবদিহি। এই ধারাবাহিকতা ছাড়া শুধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পরিবর্তন করলে স্থানীয় সরকারের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

উন্নয়নকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে স্থানীয় সরকারকে আর দুর্বল, নির্ভরশীল ও প্রকল্পনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখা যাবে না। এটিকে হতে হবে জনগণের সবচেয়ে কাছের কার্যকর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে। তাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, এই নির্বাচন হবে জনগণের ভোটাধিকার, অংশগ্রহণ ও আস্থার একটি বাস্তব পরীক্ষা। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। কারণ একটি ভোট শুধু একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত করে না, সেই ভোট একটি ইউনিয়নের আগামী দিনের নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও জবাবদিহির পথও নির্ধারণ করে।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এবং জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া স্থানীয় সরকারই পারে উন্নয়নকে বাস্তব অর্থে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে, যদি নির্বাচনটি হয় সত্যিকার অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। তাই শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ছাড়া শক্তিশালী জনসেবা সম্ভব নয়, আর বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া শক্তিশালী স্থানীয় সরকারও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

শক্তিশালী স্থানীয় সরকারই একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন তাই কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি যোগ্য, সৎ, দক্ষ ও জনবান্ধব নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জনগণের স্বাধীন অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই নির্বাচনকে অর্থবহ করে তুলতে হবে। জনগণকে সচেতনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আসুন, দল-মত ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য নেতৃত্বকে নির্বাচিত করে শক্তিশালী ইউনিয়ন পরিষদ গড়ে তুলি—গড়ে তুলি উন্নত, স্বচ্ছ ও জনকল্যাণমুখী শক্তিশালী স্থানীয় সরকার।

লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি
ফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮
ইমেইল: lionganibabul@gmail.com

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
Theme Customized BY LatestNews